ভাঁজ হওয়া ফোন নিয়ে যত কাহিনী!

0

গত কয়েক বছরে টেকনোলজির প্রতিটি সেক্টরে রেডিকেল চেঞ্জ লক্ষ্য করা গিয়েছে। ব্লকচেইন, ইন্টারনেট অফ থিংস, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি আর অগমেন্টেড রিয়্যালিটির মত অভিনব সব টেকনোলজির হাত ধরে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুচনা হয়েছে। বদলে গেছে প্রতিটি মানুষের হাতে থাকা স্মার্টফোন গুলোও। তবে স্মার্টফোনের ডিজাইন এবং টেকনলজির দিক থেকে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে তা হল, ফ্লেক্সিবল ডিসপ্লে যুক্ত ফোন বা, ফল্ডেবল ফোন। আমরা অনেকেই মাত্র কিছুদিন হল এই ডিসপ্লে সম্পর্কে জেনেছি। তবে এই ডিসপ্লে প্রথম দেখা যায় ১৯৭০-এর দিকে।

“Gyricon” নামের এক ধরনের পেপার স্ক্রিন ছিল যাতে শুধু সাদা এবং কালো কালার দেখা যেতো। তখন কাগজের মতো এই স্ক্রিন শুধু মাত্র সুপার শপ জিনিষ পত্রের দাম লিখার জন্য কাজে লাগতো। কিন্তু আজকের এই ফ্লেক্সিবল ডিসপ্লের কনসেপ্ট “Gyricon” থেকেই এসেছে।

Gyricon পেপার স্ক্রিন

তবে তখন প্রযুক্তি অতোটা উন্নত ছিল না। এলজি, সনি এবং নোকিয়ার মত কোম্পানি গুলো ২০০০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ফ্লেক্সিবল ডিস্প্লে নিয়ে কাজ করলেও স্যামসাং ২০১০ সালে প্রথম ফ্লেক্সিবল ডিস্প্লের একটি প্রটোটাইপ তৈরি করে। তখন থেকেই ফোল্ডেবল ফোন তৈরির বিষয়টি মাথায় আসে সবার। এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি ফোল্ডেবল ফোন বাজারে এসেছে, চলুন সেগুলো থেকে কয়েকটা ফোন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসি।

১) Samsung Galaxy Fold – স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোল্ড

আমাদের লিস্টের প্রথম ফোনটি হল স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোল্ড। সামসাং-এর নতুন এই ফোল্ডেবল ফোনের রিলিজ ডেইট ঠিক করা হয়েছে ২০১৯ সালের April এর 26 তারিখ। এবং সবকিছুর আগে বলে নেই, এই ফোনটির দাম হবে প্রায় ২০০০ ইউএস ডলার। ফোনটিতে আছে ২ টি ডিসপ্লে। ভাজ খুললে ৭.৩ ইঞ্চির মেইন ডিসপ্লে পাওয়া যাবে আর ভাঁজ করা অবস্থায় পাওয়া যাবে ৪.৬ ইঞ্চ ফুল এইচডি+ সেকেন্ডারি ডিসপ্লে। ফোনটিকে অনেকটা নোটবুক কিংবা ডায়রির মত ভাঁজ করে রাখা যাবে এবং ভাঁজ থাকা অবস্থায় ফোনের উপরের ছোট সেকন্ডারি ডিস্প্লেটি ইউজ করতে হবে আর ভাঁজ খুলে এক্সেস করতে হবে মেইন ডিসপ্লেটিকে।

২ টি ডিসপ্লেই একই রকম কাজ করবে, সাইজ ছাড়া অন্য কোন লিমিটেশন নেই সেকন্ডারি ডিসপ্লেতে। ফোনটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এর অ্যাপ কন্টিনিউটি ফিচার। অর্থাৎ, সেকেন্ডারি স্ক্রিনে কোন অ্যাপ ওপেন করে ফোনটিকে আনফোল্ড করলে সেইম অ্যাপটি তৎক্ষণাৎ মেইন ডিসপ্লেতে চলে আসবে। ফোনটি ৪ টি কালারে পাওয়া যাবে, Space Silver, Cosmos Black, Martian Green এবং Astro Blue।

৪ টি কালারে স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোল্ড

অত্যাধুনিক এই ফোনের প্রসেসরটিও নতুন ৫জি সাপোরটেড ৭ ন্যানোমিটারের স্ন্যাপড্রাগন ৮৫৫ চিপ। এতে থাকবে ১২ জীবী র‍্যাম এবং ৫১২ জীবী ইন্টারনাল স্টোরেজ। ভিডিও প্রসেসিং-এর জন্য থাকবে Adreno 640 জিপিইউ। এতে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে দেওয়া হয়েছে অ্যান্ড্রয়েড ৯.০ পাই এবং তার উপরে থাকবে সামসাঙ্গের One UI. ফোনটির পেছনে থাকবে টোটাল ৩ টি ক্যমেরা, প্রথমটি 12 মেগাপিক্সেল wide-angle (f/1.5 to f/2.4) লেন্স; দ্বিতীয়টি 12 মেগাপিক্সেল Telephoto (f/2.4) লেন্স; এবং লাস্টলি 16 মেগাপিক্সেল Ultra-wide (f/2.2) লেন্স। এছাড়াও ফোনটি ভাঁজ থাকা অবস্থায় পাওয়া যাবে ১০ মেগাপিক্সেলের একটি সেলফি ক্যমেরা এবং ভাঁজ খোলা অবস্থায় সেলফি তুলার জন্য পাওয়া যাবে ১০ মেগাপিক্সেলের সাথে আরও একটি ৮ মেগাপিক্সেলের Depth Sensing ক্যমেরা। সর্বমোট ৬ টি ক্যমেরা আছে এই ফোনে। আর পাওয়ার বাটনে এটাচ করে দেওয়া হয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারটিকে।

ফোনটি আনফল্ড করলে ডান পাশে উপরে দেখা যায় বড় একটি কর্নার নচ, যেখানে রাখা হয়েছে সামনের ক্যমেরা গুলোকে। সফটওয়্যারের দিক থেকেও বেশ কিছু নতুন ফিচার যুক্ত করা হয়েছে ফোনে। যেমন এই ফোন দিয়ে তিনটি অ্যাপ একসাথে ওপেন করে মাল্টিটাস্কিং করা যাবে।

স্যামসাং গেলাক্সি ফোল্ডে ২ টি বেটারি থাকবে যেগুলোকে একসাথে করলে 4,380 mAh সমান পাওয়ার সাপ্লাই করবে।

তবে স্যামসাং-এর ভাষ্য মতে এই সুপার প্রিমিয়াম ফোনটি অন্যান্য ফোনের মত অতোটা সহজলভ্য হবে না। স্প্যাশাল কিছু স্টোর ছাড়া ডিসপ্লেতেও রাখা হবে না এই ফনেটিকে। দাম আর সহজলভ্যতার কথা চিন্তা করলে বেশিরভাগ মানুষের হাতের নাগালের বাইরেই থাকবে চোখ ধাধানো এই ডিভাইস। আমাদের বাংলাদেশে কবে নাগাদ আসতে পারে সে নিয়েও কোন প্রকার আন্দাজ করা যাচ্ছে না।

২) Huawei Mate X – হুয়ায়েই মেট এক্স

স্যামসাং-এর ডিজাইনকে অনেক দিক থেকেই হারিয়ে দিয়েছে চাইজিন কোম্পানির নতুন এই ফল্ডেবল ফোন। স্যামসাং থেকে হুয়ায়েইর ফোনের সবচেয়ে বড় যে পার্থক্য তা হল, এই ফোনটি বাইরের দিকে ভাঁজ হয় যেখানে স্যামসাং ভাঁজ হয় ভেতরের দিকে। বাইরের দিকে ভাঁজ হওয়ায় একটা বড় ডিসপ্লেকেই ভাঁজ করে ২ টি ডিসপ্লে বানিয়ে ফেলা যায়। তার মানে ভাঁজ করলে ফোনের উপরে এবং নিচে ২ পাশেই ডিসপ্লে থাকে। ভাঁজ থাকা অবস্থায় এক পাশের ডিসপ্লে কাজ করে অপর পাশেরটি শুধু মাত্র ব্যাক প্যানেল হিসেবে কাজ করে।

হুয়ায়েই মেট এক্স

নতুন এই ফোনের আরেকটি চমকপ্রদ দিক হল এর সুপার ফাস্ট ৫জি স্পীড। বলা হচ্ছে এই ফোনে দিয়ে ১টি ১ জীবী মুভি মাত্র ৩ সেকেন্ডে ডাউনলোড করা যাবে। ডিজাইন সহ বেশ কিছু যায়গায় স্যামসাং ফোল্ডকে পেছনে ফেলে দেওয়া হুয়ায়েই মেট এক্স এর দামও স্যামসাং-এর ফল্ডেবল ফোন থেকে বেশি। মেট এক্স হাতে পেতে হলে গুনতে হবে প্রায় ২৬০০ ইউএস ডলার।

সুপার প্রিমিয়াম এই ফোনটি ফোল্ড করলে ২ টি ডিসপ্লে লক্ষ্য করা যায়, সামনের দিকে থাকে ৬.৬-ইঞ্চির ১৯.৫:৯ এসপেক্ট রেশিও’র এজ টু এজ ডিসপ্লে যার রেজুলেশন ২,৪৮০ x ১১৪৮ এবং পেছনে থাকে ৬.৩৮ ইঞ্চির ২৫:৯ এসপেক্ট রেশিও’র ২,৪৮০ x ৮৯২ পিক্সেল রেজুলেশনের ডিসপ্লে। এবং আনফোল্ড করলে পাওয়া যায় ৮ঃ৭.১ এসপেক্ট রেশিউ’র এস্টনিশিং ৮ ইঞ্চ ফুল ভিউ ডিসপ্লে যার রেজুলেশন ২৪৮০ x ২২০০ পিক্সেল। সব গুলো ডিস্প্লেই ব্রাইট এবং কালারফুল তবে স্কিন গুলো পুরোপরি প্লাস্টিকের হওয়ার ডিস্প্লেটি বেশ নরম এবং টাচ করলে বেশ spongy ফিল হয়।

স্পেকের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় ফোনটিতে দেওয়া হয়েছে হুয়ায়েইর ফ্ল্যাগশিপ ফোনের হার্ডওয়্যার, এতে থাকবে Kirin 980 চিপের প্রসেসর, 8GB RAM এবং 512GB ইন্টারনাল স্টোরেজ। সেই সাথে ২৫৬ জীবী পর্যন্ত মেমরি কার্ডও এক্সাপান্ড করা যাবে। ফনেটির একপাশে রাখা হয়েছে ৩ টি ক্যামেরা, যা আনফোল্ড অবস্থায় পেছনের ক্যামেরা হিসেবে কাজ করবে এবং ফোল্ড করলে ব্যবহার করা যাবে সেলফি ক্যমেরা হিসেবে।

ফোনটি দিয়ে কারও ছবি তুলতে গেলে সামনে এবং পেছনে উভয় স্ক্রিনে ক্যামেরার রিয়াল টাইম ভিউ দেখা যায়। যার ফলে ছবির সাবজেক্ট নিজেই তার ছবির ফ্রেম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে

হুয়ায়েই মেট এক্সের ছবি তোলার দৃশ্য

তিনটি ক্যামেরার প্রথমটি ৪০ মেগাপিক্সেলের দ্বিতীয়টি ১২ মেগাপিক্সেলের এবং তৃতীয়টি ৮ মেগাপিক্সেলের। হুয়ায়েইর নতুন ফ্ল্যাগশিপ P30-এর ক্যামেরা গুলোর মতই ক্যামেরা ইউজ করা হয়েছে এতে। এছাড়া হুয়ায়েই মেট এক্স-এ দেওয়া হয়েছে 4,500mAh ব্যাটারি যেগুলো ফোনের ২ পাশে ২ টি সেলে ভাগ করা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ফোনটিতে থাকবে হুয়ায়েইর 55 ওয়াটের SuperCharge টেকনোলজি।

সব মিলে স্যামসাং-এর বড় একটি প্রতিদন্ধী হয়ে দাঁড়িয়েছে ফার্স্ট জেনারেশনের এই ফোল্ডেবল ফোন হুয়ায়েই মেট এক্স।

৩) TCL Foldable Phone – টিসিএল ফোল্ডেবল ফোন

এই ফোনটি নিয়ে খুব একটা বিস্তারিত এখনও পাওয়া যায় নি। তবে MWC ২০১৯-এ TCL তাদের একটি প্রোটোটাইপ শোকেস করেছে এবং  তাদের প্ল্যান হল আরও কম দামে ফোল্ডেবল ফোন অফার করা।

টিসিএল ফোল্ডেবল ফোন

স্যামসাং আর হুয়ায়েইর ফোন গুলোর কাছে iPhone কেও এফোরডেবল মনে হয়, সেই যায়গায় TCL এর কম দামে সর্বসাধারণের জন্য ফোল্ডেবল ফোন তৈরি করার প্ল্যানটা অনেকটাই কাজে আসবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে। এবং এই ফোনটি ২০২০ সাল নাগাদ বাজারে আসবে।

৪) Xiaomi Foldable Phone – শাওমি ফোল্ডেবল ফোন

শাওমির ফোল্ডেবল ফোন সম্পর্কে এখনো তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে এর ২ টি টিজার ভিডিও অফিশিয়ালি ছাড়া হয়েছে। ২ টি ভিডিওতেই দেখা যায় ফোনটি ২ পাশ থেকে পেছনের দিকে ২ টি ভাঁজ করা যায়। ভাঁজ করা অবস্থায় পেছনের স্ক্রিন গুলো কেবলি একটি ব্যাক-পার্ট হিসেবে কাজ করে।
শাওমির ফোল্ডেবল ফোন


সব দেখে বুঝা যায় যে শাওমি ফোল্ডেবল ফোনের দিক থেকে হুয়ায়েই মেট এক্স থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।

৫) Oppo Foldable Phone – অপ্পো ফোল্ডেবল ফোন

অপ্পোর ফনেটি অনেকটাই হুয়ায়েই মেট এক্স এর মত। তারা যদিও এর ফিসিকেল কোন ভার্সন MWC বা অন্য কোথাও শো করে নি, কিন্তু তাদের সশাল মিডিয়ায় সেই ফোনের কিছু ছবি এবং ছোট একটি ভিডিও ক্লিপ রিলিজ করেছে যা থেকে মনে হচ্ছে অনেকটাই হুয়ায়েই মেট এক্স এর মত দেখতে হবে অপ্পোর প্রথম ফোল্ডেবল ফোন।


অপ্পো ফোল্ডেবল ফোন

৬) Royole Flexpai – রয়াল ফ্লেক্স পাই

এই ফোনটি হল প্রথম কনজিউমার মার্কেটের জন্য তৈরি করা ফোল্ডেবল ফোন যেটি আমরা CES 2019 -এই দেখতে পেয়েছি। এমডব্লিউসি তে ফোনটির সফটওয়্যার সহ বেশ কিছু জিনিষ আপডেট করা হয়েছে যার ফলে এর পারফরমেন্স আগের থেকে একটু বেটার হয়েছে।

রয়াল ফ্লেক্স পাই

তবে যারা এই ফোনটিকে সামনে থেকে দেখেছে তাদের সবার ভাষ্য মতে এই ফোনটি এখনো ব্যাবহারেরে যোগ্য হয় নি। হয়তো ভবিষ্যতে এটিকে আরও আপডেট/আপগ্রেড করা হবে।

শেষ কথা

হুয়ায়েই মেট এক্স হাতে আমি

হুয়ায়েই বাংলাদেশের আয়োজনে বাংলাদেশে মেট এক্সের শোকেস প্রোগ্রামে ফোনটি কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়। আমি মনে করি শুধু ডিসপ্লেকে ভাঁজ করে ছোট বড় করার জন্য এতো বেশি টাকা অনেকেই খরচ করবে না। হয়তো নতুন টেকনলজির কারনে সবাই খুব এক্সাইটেড কিন্তু এর আসল ব্যাবহারবিধি নিয়ে আমি সন্দিহান। ফোল্ডেবল ডিসপ্লে হওয়ায় বেশ কিছু ঝুঁকিও থেকে যায় ফোনটির ডিউরেবিলিটি নিয়ে। তাই ফোন গুলো যখন একটু সহজলভ্য হবে তখন এর কদর কয়জন করবে তা এখন শুধু সময়ই বলে দিতে পারবে। তবে ২০১৯/২০-এ সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড হবে এই ফোল্ডেবল ফোন। যার ফলে অন্যন্য বড় মেনুফেকচারার গুলোও ধীরে ধীরে যোগ দেবে নতুন এই ফ্লেক্সিবল দিসপ্লের দৌড়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 + 3 =